......কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছায়া তখন মাটিতে পড়ে রয়েছে। তারি নিচে বসে লাবণ্য--চক্ষু রোদনে আদ্র, শাড়ির আঁচল দিয়ে সে ঘন ঘন চোখ মুছে নিচ্ছে। চারিদিকে কৃষ্ণচূড়ার ফুল পড়ে যেন লাল গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে আর তারি মাঝে লাবণ্য সাদা শাড়ী আর সেই রঙেরই আলোয়ান পড়ে বসে আছে যেন দিশেহারা লাল সমুদ্রের মাঝে এক উজ্জ্বল রাজহংসী। কিন্তু এহেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও লাবণ্যকে আনন্দ দিচ্ছে না--কি একটা যন্ত্রণা তাকে দগ্ধ করছে, একটা বোবা ব্যথা। অমিত কি সত্যি তার সাথে প্রতারণা করল? জগতের সমস্ত পুরুষকে যখন সে- স্বার্থলভি, অহংকারী রূপে আভসিক্ত করতে যাচ্ছে তখনি আদুরে অমিতের আগমন ঘটল।
আগমন ঠিক নয়--যেন প্রভুর বাড়ীতে সে ঢুকছে চুপি চুপি, চুরি করতে। শীতে প্রতিরক্ষার কোনও ব্যবস্থাই নেই, শুধু একখানি ডোরাকাটা ছাইরঙ্গের হাফ-সোয়েটার ছাড়া। অমিত ব্যারিস্টার, মানুষের মন বুঝতে যদিও law লাগেনা তবুও অমিত বিধাতার এই law যেন আগে শিখেছে! সে সটান গিয়ে দাঁড়াল লাবণ্যর সামনে--
বলুন হে দেবী, এই পাপীর কি সাজা হওয়া উচিত?
লাবণ্য বিমুখ, বাক-হীন। মুখটা বাকিয়ে এমন ভাব আনবার চেষ্টা করল যেন অমিতের আগমনকে সে গ্রাহ্যই করে না, এমনকি অমিতের জন্য তার কোনও প্রতীক্ষাই ছিল না। সে আদুরের ম্রিয়মাণ সূর্যটাকে দেখতে লাগল।
বিধাতা মানুষ গড়তে এখানেই করেছেন ভুল, মনের সঙ্গে বাহ্যিক ব্যবহার পেরে ওঠে না। মন যেন কস্তূরী মৃগ, বাইরে যতই গাছের ঘেরাটোপ থাকুক না কেন গন্ধ সে ছড়াবেই। লাবণ্যর মনে যে আগুন জ্বলছে, বাইরের ঠুনকো আবরণ দিয়ে সে কি করে আটকায়? তবুও, সে শিক্ষিতা এবং মনের মহিমা সে জানে, তাই পাথরের পাটাতন থেকে উঠে বাগানের দিকে যে সরু গলিটা গিয়েছে সেদিকে রওনা দিল।
এদিকে লাবণ্যর এহেন আচরণে অমিত একেবারেই অপ্রস্তুত। সে যুদ্ধকালীন তৎপরতাই লাবণ্যর সামনে গিয়ে তার পথ্রুদ্ধ করল। লাবণ্য তখন তার ভ্রূ দুটি এমনভাবে বাঁকালও যে অমিতের তৎক্ষণাৎ হাসি পেয়ে গেল। কিন্তু এহেন সময়ে হাসা বোকামি বিবেচনা করে অমিত আত্মপক্ষ সমর্থনে নানা কথা বলতে লাগল। সে বলে চলল প্রস্তুরিভুত এক মূর্তির সামনে-
কি করি বল বন্যা(লাবণ্য), পবন দেব যে আমার উপর বিমুখ, নৌকার পালে হাওয়াই দিলে না। ওদিকে মাঝি-ভাই এক দার্শনিক, বলে কিনা তার কোনও তাড়াই নেই, তার দিলদরিয়ায় বন্যা বইছে, ভেঙেছে বাঁধ সবকিছুর। তাকে যতই বলি শীঘ্রতার কথা, ততই সে চলে কদম চালে। আমিও আর থাকতে পারলাম না, শুনিয়ে দিলাম নিবারণ চক্রবর্তীর দু চার খানি কবিতা, কবিতা বুঝল কিনা জানি না কিন্তু প্রশংসাই পঞ্চমুখ। এ হল গিয়ে আমার নদী মন্থনের কাহিনী। ছোটবেলাই শুনেছি বণিকেরা নাকি বছরের পর বছর কাটাতেন সমুদ্রে বাণিজ্য করতে। তবে আমার এই নদী পেরতে দের-ঘণ্টার বেশি লাগাই উচিত ছিল না কোনমতে, কিন্তু কি কুক্ষণে আমি প্রিয়ার কাছে না এসে চারিটি ঘণ্টা কাঁটিয়ে দিয়ে আসলাম নদীর বুকে। রাগ করলে বন্যা? বল তোমার এই অপরাধীটির কি শাস্তি আজ্ঞা হয়। তাই মাথা পেতে নেব।
অমিত একটু বেশী কথা বলে--একবার বাঁধ ভাঙলে তাকে ঠেকান অসম্ভব হয়ে পড়ে। অমিতের এই স্বভাবের সঙ্গে লাবণ্য পরিচিত অনেকদিন ধরেই।অমিত বলেই চলল--
তবে বলতে পার একপ্রকার বাণিজ্যই করে আসলাম। দেখবে কি এনেছি ভান্দভরে? এর মূল্য আমি অর্থ দিয়ে মেটাতে পারিনি বন্যা, অনেক দরকষাকষির পর একপ্রকার অপহরণ করেই নিয়ে আসলাম। দেখবে বন্যা?
লাবণ্য ভাবুক। প্রকৃতির ছোটখাটো-তুচ্ছ জিনিসও তাকে এমনভাবে ভাবিয়ে তোলে যা কল্পনাতীত। তার মন ভারি স্পর্শকাতর। সে নীল রঙের নামনাজানা ফুলটার দিকে তাকাল। মুখের ভাবে তার এখন প্রাণের স্পন্দন পাওয়া গেল। নেমে এলো ঝর্না, স্বরনালীর গহ্বর থেকে বেরিয়ে এলো শব্দ।
অমিত লাবণ্যকে জড়িয়ে ধরল দু হাত দিয়ে, বুকে মাথা গুজে অঝোর অশ্রুধারায় অমিতের বুক ভাসিয়ে দিল লাবণ্য,বন্যা শেষমেশ পেল তার মিতা।